কসরের নামাজের নিয়ম । কসরের নামাজ কখন পড়তে হবে ! মুসাফির এর নামাজ

Contents

কসরের নামাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ

মানুষের জীবনেরই একটি অন্যতম অংশ হলো সফর। প্রতিটি মানুষই জীবনে কমবেশী সফর করে থাকে। এটি আসলে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মানুষ যখন নিজের আবাসস্থলে থাকে, তখন পূর্ণাঙ্গ নামাজ আদায় করতে হয়। কিন্তু ভ্রমণে বা সফরে গেলে কসর আদায় করতে হয়। কসর মানে নামায সংক্ষেপ করা অর্থাৎ চার রাকাতের জায়গায় দু’রাকাত আদায় করা।
শরিয়ত নির্ধারিত পরিমাণ দূরত্বে কেউ যদি সফর করে,তখন তার নামায কসর করতে হয়,এটাই ইসলামের বিধান। আর এইভাবে সংক্ষেপে নামাজ পড়ার ভেতর আল্লাহ তাআলা কল্যাণ রেখেছেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
তোমরা যখন জমিনে সফর করবে, তখন তোমাদের জন্য নামাজের কসর করায়— কোনো আপত্তি নেই। (সুরা নিসা, আয়াত: ১০১)
কোনো ব্যক্তি তার অবস্থানস্থল থেকে ৪৮ মাইল তথা ৭৮ কিলোমিটার দূরে সফরের নিয়তে বের হয়ে তার এলাকা পেরিয়ে গেলেই শরিয়তের দৃষ্টিতে সে মুসাফির হয়ে যায়- (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ ১/৪৩৬, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/১০৫)
সফরসম দূরত্বের উদ্দেশে নিজ এলাকার বসতি ত্যাগ করলে অর্থাৎ গ্রামের অধিবাসী নিজ গ্রাম ছাড়লে, শহরের অধিবাসী শহর ত্যাগ করলে এবং সিটি শহরে বসবাসকারী সিটি শহর থেকে বের হওয়ার পর থেকে মুসাফির গণ্য হবে। অনুরূপ সফর থেকে ফিরে আসার ক্ষেত্রেও নিজ এলাকার সীমানায় প্রবেশের সঙ্গেই তার সফরের বিধান শেষ হয়ে যাবে।(ফতোয়া শামি ২/১২৮)

মুসাফিরের নামাযের বিধান

মুসাফিরের জন্য সফর অবস্থায় কোনো মুকীমের ইক্তিদা না করলে কসর করা অর্থাৎ চার রাকাত বিশিষ্ট ফরয নামায দুই রাকাত পড়া জরুরি।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
فَرَضَ اللهُ الصَّلَاةَ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْحَضَرِ أَرْبَعًا، وَفِي السَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ.
আল্লাহ তাআলা তোমাদের নবীর যবানে নামাযকে মুকীম অবস্থায় চার রাকাত ও সফর অবস্থায় দুই রাকাত ফরয করেছেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৮৭
আর মুকিমের পিছনে ইকতিদা করলে পূর্ণ নামাযই পড়তে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
إِذَا دَخَلَ الْمُسَافِرُ فِي صَلَاةِ الْمُقِيمِينَ صَلَّى بِصَلَاتِهِمْ.
মুসাফির যদি মুকিমদের সাথে নামাযে শরীক হয় তবে সে তাদের মত (চার রাকাত) নামায পড়বে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩৮৪৯
আর মাগরিব, বিতর ও ফজরের নামায পূর্ণই আদায় করতে হবে। এগুলোর কসর নেই। তেমনিভাবে সুন্নত নামাযেরও কসর হয় না। তাই সুন্নত পড়লে পুরোই পড়বে।
প্রকাশ থাকে যে, সফর অবস্থায় পথিমধ্যে তাড়াহুড়া ও ব্যস্ততার সময় সুন্নত পড়বে না। আর গন্তব্যে পৌঁছার পর সুন্নত নামায পড়াই উত্তম।
উল্লেখ্য যে, বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী সফর অবস্থায় সুন্নতে মুআক্কাদা নামাযগুলো মুকীম অবস্থার ন্যায় আবশ্যক থাকে না; বরং সাধারণ সুন্নতের হুকুমে হয়ে যায়।
মাসিক আল-কাউসার; শরহু মুখতাসারিত তহাবী ২/৯১; আলমুহীতুল বুরহানী ২/৩৮৩; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৩১
মাসআলা-মুসাফির ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সফর অবস্থায় চার রাকাত নামাজ পূর্ণ করলে গুনাহ হবে।এ ক্ষেত্রে নামাজ পুনরায় পড়া ওয়াজিব। আর যদি ভুলক্রমে চার রাকাত পূর্ণ করে নেয়, তাহলে যদি সে প্রথম বৈঠক করে থাকে, তাহলে সেজদা সাহু করে নিলে ফরজ নামাজ আদায় হয়ে যাবে, আর যদি প্রথম বৈঠক না করে থাকে তাহলে ফরজ আদায় হবে না, আবারও পড়তে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ১/৯১)
মাসআলা-ড্রাইভার সফর পরিমাণ দুরত্বে সফরকালে পথিমধ্যে মুসাফির গণ্য হবেন। আর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে এক এলাকায় ১৫ দিন বা তার বেশি অবস্থানের নিয়ত না থাকলে সেখানেও মুসাফির হিসাবে নামায কসর করবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৩৯
মাসআলা-কোনো ব্যক্তি সফরের নিয়ত ব্যতীত শরীয়ত নির্ধারিত পরিমাণ দুরত্ব অতিক্রম করলেও শরীয়তে সে মুসাফির বলে গণ্য হবে না। ফাতাওয়ায়ে শামি ২/১২২

মুসাফিরের জুমার নামাজ এবং ইমামতি

মুসাফিরের জন্য জুমআ পড়া ফরয নয়। সে যোহর বা জুমআ যে কোনোটি পড়তে পারে। আর মুসাফির জুমআর ইমামতিও করতে পারবে। এবং তার পিছনে মুকীমের ইক্তিদা সহীহ হবে। দুররুল মুখতার ২/১৫৩

কারো বসবাসের স্থান দুধরনের হতে পারে-

১.ওয়াতনে আসলী(স্থায়ী আবাস)
২. ওয়াতনে ইক্বামত (অস্থায়ী আবাস)

ওয়াতনে আসলী(স্থায়ী আবাস)

মাসআলা- ওয়াতনে আসলী মানুষের এমন নিজস্ব বাসস্থানকে বলে যেখানে সে জন্মগ্রহন করেছে অথবা তার পরিবার বসবাস করে অথবা যেখানে সে চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের নিয়ত করেছে।- আদ্দুররুল মুখতার ২/১৩১
মাসআলা-ওয়াতনে আসলীর জন্য বাড়ী,জায়গা ও স্থায়ীভাবে বসবাসের নিয়ত জরুরী।–প্রাগুক্ত
মাসআলা-ওয়াতনে আসলী একাধিক হতে পরে। যেমন কেউ নতুন করে শহরে বাড়ী করল। আর পূর্ব থেকে তার গ্রামে বাড়ী রয়েছে। এখন সে যদি উভয় বাড়ীতে আসা-যাওয়া করে এবং উভয়টিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের নিয়ত করে তবে উভয়টি তার জন্য ওয়াতনে আসলী হবে। -আল বাহরুর রায়েক ২/১৩৬
মোটকথা ওয়াতনে আসলী নির্ধারনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিয়তই মূল। সে যদি দুটি স্থানকে ওয়াতনে আসলী বানায় এবং উভয়টিতে স্থায়ীভাবে থাকার নিয়ত করে ( এখানে কিছু দিন ওখানে কিছু দিন) তবে উভয়টি তার জন্য ওয়াতনে আসলী গন্য হবে। -ফাতাওয়া উসমানী ১/৫৪৬।
মাসআলা- কারো যদি স্থায়ী আবাস দু’টি থাকে অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তির দু’টি এলাকায় বাড়ি থাকে এবং সে উভয় এলাকায় বসবাসের ইচ্ছা পোষণ করে, তবে সে উভয় স্থানেই পূর্ণ নামায পড়বে, যদিও তার অবস্থানের মেয়াদ ১৫ দিনেরও কম হয়।
কিন্তু যদি তার উদ্দেশ্য হয় শুধুমাত্র একটি এলাকাকে স্থায়ী আবাস বানানো তাহলে যে এলাকাকে স্থায়ী আবাস বানানোর নিয়ত নেই সে ঐ এলাকায় পনের দিনের কম অবস্থানের নিয়ত করলে কসর পড়বে।
আর যদি পনের দিন বা তার বেশি সময় অবস্থান করে, তাহলে পুরা নামায আদায় করবে।
উভয় ক্ষেত্রে, যদি দুই স্থায়ী আবাসের মধ্যে সফরের দূরত্বের চেয়ে বেশি দূরত্ব হয় (উদাহরণস্বরূপ: করাচি এবং ইসলামাবাদ), এবং এর মধ্যে চার রাকাত নামাজের সময় আসে, তবে সফরের সময় সেই নামাজ কসর পড়বে। আল-বাহরুর রায়েক ২/১৩৬
মাসআলা-কেউ শহরে চাকুরী করে। সেখানে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। তবে গ্রামে তার বাড়ী রয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানে গিয়ে বসবাস করার নিয়ত করেছে । এবং মাঝে-মধ্যে গ্রামে বেড়াতে যায়। তবে তার গ্রামের বাড়ীটি তার জন্য ওয়াতনে আসলী হবে। পক্ষান্তরে যদি উক্ত লোকটি গ্রামের বাড়ীটি তার নিজ বাড়ী হিসাবে বহাল না রাখে এবং পরবর্তিতে সেখানে বসবাসের নিয়ত না থাকে এবং আসা-যাওয়া বন্ধ করে দেয় তবে গ্রামের বাড়ীটি তার জন্য আর ওয়াতনে আসলী থাকবে না। -রদ্দুল মুহতার ২/১৩১।
মাসআলা-কারো কোন স্থানে শুধু জমিন থাকলে এর দ্বারা তা ওয়াতনে আসলী গন্য হবে না। -আদ্দুররুল মুখতার ২/১৩১।

ওয়াতনে আসলীর হুকুম-

মাসআলা- ওয়াতনে আসলীতে কেউ মুসাফির হয় না।কেউ ওয়াতনে আসলীতে ১ ঘন্টার জন্য গেলেও মুকীম গন্য হবে। আর সে চার রাকাআত বিশিষ্ট ফরজ নামায চার রাকাআতই পড়বে। কসর জায়েয নেই।-আদ্দুররুল মুখতার ২/৬১৪ (যাকারিয়া)।

ওয়াতনে ইক্বামত(অস্থায়ী আবাস)

মাসআলা-কেউ কমপক্ষে ৪৮ মাইল সফর করে কোন স্থানে গিয়ে কমপক্ষে ১৫দিন থাকার নিয়ত করলে তা তার জন্য ওয়াতনে ইক্বামত হিসাবে গন্য হবে। ১৫দিনের কম থাকার নিয়ত করলে ওয়াতনে ইকামত হবে না। -আল বাহরুর রায়েক ৪/৩৪১।
মাসআলা-ওয়াতনে ইক্বামত সফরের দ্বারা বাতিল হয়ে যায়। অর্থাৎ কেউ কোন স্থানে কমপক্ষে ১৫দিন থাকার পরে সেখান থেকে সফর করে (কমপক্ষে ৪৮মাইল দুরুত্ব অতিক্রম করে) চলে এলে তার ওয়াতনে ইক্বামত বাতিল হয়ে যায়। পরে কোন দিন উক্ত স্থানে পূনরায় গেলে ১৫ দিন থাকার নিয়ত ব্যতীত তা তার জন্য ওয়াতনে ইক্বামত হবে না। তবে নতুন করে আবার ১৫দিন থাকার নিয়ত করলে তা তার জন্য ওয়াতনে ইক্বামত হবে। -মারাকিল ফালাহ ১/১৮৭
মাসআলা-কেউ কোন স্থানে সফর করে গিয়ে কমপক্ষে ১৫ দিন থাকল। অতঃপর তার সামানপত্র সেখানে রেখে গিয়ে উক্ত স্থান থেকে চলে গেল। এর পর সেখানে ১৫দিনের কম থাকার নিয়তে গেলেও সে মুকীম গন্য হবে। তবে তার সামানপত্র সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলে কমপক্ষে ১৫ থাকার নিয়ত ব্যতীত সে উক্ত স্থনে মুকীম গন্য হবে না।-বাদায়েউস সানায়ে ১/১০৪, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/১০৮-১১২।
মাসআলা-বিভিন্ন চাকুরীজীবী ও পেশাজীবীরা শহরে বাসা ভাড়া করে থাকে। তারা গ্রামের বাড়ীতে গেলেও বাসায় সামানপত্র রেখে যায়। কাজেই শহরে তারা মুকীম গন্য হবে। তবে এক্ষেত্রে একবার একটানা ১৫ দিন থাকা শর্ত। -আদ্দুরুরল মুখতার ১/১২৩
মাসআলা -কোনো জায়গায় ১৫ দিন বা ততধিক অবস্থানের নিয়ত করলে সে সেখানে মুকিম হয়ে যাবে। সেখান থেকে সামানা-পত্রসহ প্রস্থানের আগ পর্যন্ত সেখানে পূর্ণ নামাজ পড়বে এবং মুকিমের বিধান জারি থাকবে। (বাদায়েউস সানায়ে ১/১০৪)।
মাসআলা-কেউ দুই স্থান মিলে ১৫ দিন থাকার নিয়ত করল। তবে প্রতিদিন রাতে সে এক জায়গাতে থাকবে এবং দিনে অন্যত্র অবস্থান করবে।এমতাবস্থায় সে রাতের স্থানে মুকীম হবে এবং পুরো নামায পড়বে।কিন্তু যদি দিনের কর্মস্থল রাতের স্থান থেকে ৪৮ মাইল দুরত্বে হয় তবে দিনের স্থনে সে মুসাফির হবে এবং কসর করবে। আর যদি উভয় স্থানের দুরত্ব কমপক্ষে ৪৮মাইল না হয় তবে উভয় স্থানে পুরো নামায পড়বে। মোটকথা রাতে থাকার স্থান ধর্তব্য হবে। -রদ্দুল মুহতার ২/৬০৭(যাকারিয়া)।
ওয়াতনে ইক্বামতের হুকুম
মাসআলা- ওয়াতনে ইক্বামতে মুসাফির গন্য হবে না। বরং মুকীম গন্য হবে। এবং চার রাকাআত বিশিষ্ট ফরজ নামায চার রাকাআতই পড়বে। কসর জায়েয নেই। -আল বাহরুর রায়েক ৪/৩৪০-৩৪২।

শশুর বাড়ীতে নামায

মাসআলা-মহিলারা বিবাহের আগ পর্যন্ত তার বাবার বাড়িতে স্থায়ী আবাস হিসেবে মুকিম থাকবে। তবে বিবাহের পর যদি স্বামীর বাড়িতে মৌলিকভাবে থাকে এবং বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে, তাহলে স্বামীর বাড়ি তার মৌলিক আবাসন হিসেবে ধর্তব্য হবে এবং বাবার বাড়িতে মুসাফির থাকবে, আর যদি বাবার বাড়িতে মৌলিকভাবে থাকে, তাহলে তা তার মূল অবস্থানস্থল হিসেবেই বাকি থাকবে। (আল বাহরুর রায়েক ২/১২৮, রদ্দুল মুহতার ২/১৩১)।
আর পুরুষগণ তার শ্বশুরবাড়িতে ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করলে মুসাফিরই থাকবে। হ্যাঁ, কেউ যদি সেখানে স্থায়ী আবাস করে নেয়, তাহলে তা ভিন্ন কথা।
আরও পড়ূনঃ

কসরের নাকসরের নামাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ মাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ  কসরের নামাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ  কসরের নামাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ কসরের নাকসরের নামাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ মাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ  কসরের নামাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ  কসরের নামাজের নিয়ম । মুসাফির অবস্থায় নামাজ কসরের নাকসরের নামাজের নিয়ম কসরের নাকসরের নামাজের নিয়ম কসরের নাকসরের নামাজের নিয়ম কসরের নাকসরের নামাজের নিয়ম কসরের নাকসরের নামাজের নিয়ম 

2 thoughts on “কসরের নামাজের নিয়ম । কসরের নামাজ কখন পড়তে হবে ! মুসাফির এর নামাজ”

  1. Pingback: কালোজিরার ২১ টি প্রধান উপকারিতা । কালোজিরা কে কেন সকল রোগের মহা ওষুধ বলা হয় ! - Info Guide Bd

  2. Pingback: জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম ও দোয়ার পদ্ধতি - Info Guide Bd

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *